আইসিটি ওয়ার্ড নিউজ: রাত জাগলে কী হয় আপনার মস্তিষ্কে? হরমোনের ভারসাম্যহীনতায় বাড়ছে বড় ঝুঁকি । আধুনিক জীবনযাত্রায় রাত জেগে থাকা অনেকের কাছেই অভ্যাস বা সময়ের দাবি। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া বা দীর্ঘ সময় রাত জেগে থাকা আপনার মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি হরমোনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে দিচ্ছে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ বা শরীরের জৈবিক ঘড়ি নষ্ট হওয়া।
রাত জাগলে মস্তিষ্কের স্মৃতিশক্তি কমে ও হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়। জানুন কীভাবে অনিদ্রা আপনার শরীর ও মনের স্থায়ী ক্ষতি করছে এবং এর প্রতিকার।
মস্তিষ্কের ওপর প্রভাব:
স্মৃতিশক্তি হ্রাস: ঘুমের সময় মস্তিষ্ক সারাদিনের তথ্যগুলো গুছিয়ে রাখে। রাত জাগলে নতুন তথ্য জমা রাখার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়, ফলে স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
বিষণ্নতা ও মেজাজ খিটখিটে হওয়া: ঘুমের অভাবে মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা (আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশ) ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। এতে দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ এবং খিটখিটে মেজাজ তৈরি হয়।
মস্তিষ্কের বর্জ্য পরিষ্কার বাধা: ঘুমের সময় মস্তিষ্কের ‘গ্লিমফ্যাটিক সিস্টেম’ ক্ষতিকর প্রোটিন বা বর্জ্য পরিষ্কার করে। রাত জাগলে এই বর্জ্য জমে আলঝেইমার্সের মতো রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
হরমোনের ওপর প্রভাব:
মেলাটোনিন হ্রাস: অন্ধকারে আমাদের শরীরে মেলাটোনিন হরমোন নিঃসৃত হয় যা ঘুম আনতে সাহায্য করে। কৃত্রিম আলোতে রাত জাগলে এই হরমোন তৈরি বন্ধ হয়ে যায়।
ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন: রাত জাগলে শরীরে ‘লেপটিন’ (তৃপ্তির হরমোন) কমে যায় এবং ‘ঘেরলিন’ (ক্ষুধার হরমোন) বেড়ে যায়। একারণেই রাতে জেগে থাকলে বেশি ক্ষুধা লাগে এবং দ্রুত ওজন বাড়ে।
কর্টিসল বা স্ট্রেস হরমোন: পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। এটি উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি করে।
ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স: অনিদ্রার ফলে শরীর ইনসুলিন ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারে না, যা টাইপ-২ ডায়াবেটিসের মূল কারণ।
আরও পড়ুন:
❒ বিষণ্নতা সম্পর্কে কিছু অদ্ভুত তথ্য
❒ মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য সকাল বেলা সবচেয়ে বেশি ভালো থাকে
❒ শুধু মস্তিষ্কই নয় দেহের কোষেও জমা হয় ‘স্মৃতি’
❒ অতীত নাকি ভবিষ্যৎ মানুষ কোনটা বেশি অনুমান করে
❒ নিঃসঙ্গতা কাটিয়ে উঠার উপায়
❒ একাকীত্ব ও মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকির যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা
রাত জাগলে যেসব মানসিক সমস্যা হতে পারে:
তীব্র বিষণ্নতা (Depression): গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত রাত জাগেন বা দেরিতে ঘুমান, তাদের মধ্যে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। ঘুমের অভাব মস্তিষ্কে ‘সেরোটোনিন’ নামক হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে, যা আমাদের মন ভালো রাখতে সাহায্য করে।
অ্যাংজাইটি বা দুশ্চিন্তা: পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশ ‘অ্যামিগডালা’ অতিসক্রিয় হয়ে পড়ে। ফলে ছোটখাটো বিষয়েও মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং অহেতুক দুশ্চিন্তা কাজ করে।
স্মৃতিভ্রম ও মনোযোগের অভাব: ঘুমের সময় মস্তিষ্ক তার সারাদিনের স্মৃতিগুলো গুছিয়ে রাখে। রাত জাগলে এই প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়, ফলে মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা কমে যায় এবং মানুষ দ্রুত সবকিছু ভুলে যেতে শুরু করে।
বাইপোলার ডিসঅর্ডার ও সাইকোসিস: দীর্ঘদিনের অনিদ্রা বাইপোলার ডিসঅর্ডারের মতো জটিল সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এমনকি চরম পর্যায়ে মানুষ হ্যালুসিনেশন বা অলীক কিছু দেখা ও শোনার মতো সমস্যায় (Psychosis) আক্রান্ত হতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতার জন্য প্রতিদিন অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুমের কোনো বিকল্প নেই।
তথ্যসূত্র: মেডিকেল নিউজ টুডে
❑ মনোবিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
আরও পড়ুন: ‘আর্থিক নিদ্রাহীনতা’: কেন বাজেট বিপর্যয় আপনার রাতের ঘুম নষ্ট করে?

