আইসিটি ওয়ার্ল্ড নিউজ: কলমের বিবর্তন: প্রাচীন থেকে আধুনিক যুগের লেখার যন্ত্র । কলম শুধু লেখার একটি মাধ্যম নয়, এটি মানব ইতিহাসের জ্ঞান, শিল্প ও যোগাযোগের বিবর্তনের প্রতীক। প্রথমদিকে মানুষ সরাসরি পাথর, পাতা বা দেয়ালের ওপর আঁকাতো, পরে কালি এবং কলমের ব্যবহার শুরু হয়। প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে বর্তমান ডিজিটাল যুগ পর্যন্ত এই লেখার যন্ত্রটি বহুবার পরিবর্তিত হয়েছে।
প্রথম কলম আবিষ্কারক:
কলম বা লেখার যন্ত্রের বিবর্তন একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। তাই এককভাবে “প্রথম কলম” বা “প্রথম আবিষ্কারক” চিহ্নিত করা কঠিন। বিভিন্ন যুগে লেখার প্রয়োজনে বিভিন্ন যন্ত্র উদ্ভাবিত হয়েছে।
তবে, আধুনিক কলমের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু আবিষ্কারক এবং সময়কাল নিচে দেওয়া হলো:
✪ স্টাইলাস (প্রাচীনতম লেখার যন্ত্র): স্টাইলাসের নির্দিষ্ট একক আবিষ্কারক নেই। এটি আনুমানিক ৩২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ (BCE) মেসোপটেমিয়ার সুমেরীয় সভ্যতায় প্রচলন শুরু হয়। এটি দিয়ে কাঠ বা হাড়ের সূচালো শলাকা, যা দিয়ে নরম মাটির ফলকে খোদাই করা হতো।
✪ আধুনিক কলমের অগ্রদূত: ফাউন্টেন পেন (ঝরনা কলম)
আধুনিক কলমের ধারণার প্রথম সফল রূপ হলো ফাউন্টেন পেন, যা বারবার কালি ডোবানোর ঝামেলা দূর করে।
১৮৮৪ সালে লুইস ওয়াটারম্যান (Lewis Waterman) ফাউন্টেন পেন আবিষ্কার করেন। তিনি এমন একটি ফিড (Feed) সিস্টেম ডিজাইন করেন যা বায়ুর চাপ ব্যবহার করে কালির প্রবাহকে মসৃণ ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য করে তোলে।
✪ সর্বকালের জনপ্রিয় কলম: বলপয়েন্ট পেন (Ballpoint Pen)
যে কলমটি আমরা এখন সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করি, তার আবিষ্কারক লাজলো বিরো (Laszlo Biro) ১৯৩৮ সালে বলপয়েন্ট পেন আবিষ্কার করেন। তিনি একজন হাঙ্গেরিয়ান সাংবাদিক। তিনি এমন কালি ব্যবহার করেন যা দ্রুত শুকিয়ে যায় এবং ডগায় একটি ছোট ধাতব বল ব্যবহার করেন যা কালিকে সমানভাবে কাগজে স্থানান্তরিত করে।
সুতরাং, যদি আপনি আধুনিক কলম বলতে বোঝান, তবে লুইস ওয়াটারম্যানকে (১৮৮৪) ফাউন্টেন পেনের এবং লাজলো বিরোকে (১৯৩৮) বলপয়েন্ট পেনের আবিষ্কারক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
কলমের বিবর্তন প্রাচীন থেকে আধুনিক যুগ:
১। প্রাচীন লেখার সরঞ্জাম (Ancient Writing Tools)
কলমের ধারণাটি শুরু হয়েছিল একেবারেই ভিন্নভাবে:
✪ স্টাইলাস (Stylus) ও মাটির ফলক: প্রায় ৫,২২৫ বছর আগে মেসোপটেমিয়ার সুমেরীয়রা লেখার জন্য প্রথম পরিচিত সরঞ্জাম, স্টাইলাস, ব্যবহার করত। এটি ছিল সূচালো প্রান্তের একটি কাঠ বা হাড়ের শলাকা, যা দিয়ে তারা নরম মাটির ফলকে (Clay Tablets) কিউনিফর্ম (Cuneiform) খোদাই করত।
✪ বুরুশ (Brush) ও তুলি: প্রাচীন মিশরীয়রা প্যাপিরাসে (Papyrus) লেখার জন্য সরু বুরুশ বা তুলি ব্যবহার করত। এই বুরুশগুলি নলখাগড়া বা খড় থেকে তৈরি হতো এবং এতে কালি হিসেবে কার্বনভিত্তিক কালির মিশ্রণ ব্যবহার করা হতো।
২। পালকের কলম বা কুইল (The Quill Pen)
খ্রিস্টীয় ৭ম শতক থেকে প্রায় ১২০০ বছর ধরে কুইল কলমই ছিল প্রধান লেখার উপকরণ।
✪ কীভাবে তৈরি: এটি মূলত হাঁস বা রাজহাঁসের পালকের ডগা সূচালো করে তৈরি করা হতো। পালকের ফাঁপা অংশে কালি ভরে নেওয়া হতো।
✪ গুরুত্ব: পশ্চিমা বিশ্বে চর্মপত্র (Vellum) বা পার্চমেন্টে লেখার জন্য এটি ছিল আদর্শ। এটিই প্রথম যন্ত্র যা ব্যবহারকারীকে লেখার সময় কালির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ দেয়।
✪ সমস্যা: কুইল দ্রুত ভোঁতা হয়ে যেত এবং ঘন ঘন এটিকে সূচালো করে নিতে (Sharpening) হতো।
৩। নিব কলম বা ডিপ পেন (The Dip Pen/Nib Pen)
১৮শ শতকে কুইল কলমের কার্যকারিতা উন্নত করার জন্য ধাতব নিবের ব্যবহার শুরু হয়।
✪ ধাতব নিবের সূচনা: প্রথম দিকে পিতল বা তামার নিব তৈরি হলেও, ১৯শ শতকে ইস্পাত দিয়ে তৈরি নিব ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়।
✪ কার্যপদ্ধতি: এই কলমে নিবটি বারবার কালির পাত্রে ডুবিয়ে (Dipping) কালি নিতে হতো। ধাতব নিব পালকের চেয়ে অনেক বেশি মজবুত এবং এর ডগা ভোঁতা হওয়ার সমস্যা কম ছিল।
৪। ফাউন্টেন পেন বা ঝরনা কলম (The Fountain Pen)
আধুনিক লেখার ইতিহাসে এটি ছিল একটি বড় উল্লম্ফন। ১৮৮৪ সালে লুইস ওয়াটারম্যান (Lewis Waterman) ফাউন্টেন পেনের পেটেন্ট নেন।
✪ বৈশিষ্ট্য: এটিতে একটি অভ্যন্তরীণ কালির আধার (Ink Reservoir) থাকে, যা নিবের মাধ্যমে কালিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাগজে প্রবাহিত হতে সাহায্য করে। এর ফলে লেখার সময় বারবার কালির পাত্রে ডোবানোর দরকার হয় না।
✪ বিবর্তন: প্রথম দিকে কালির আধারটি পূরণ করা কঠিন ছিল, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এটি আরও উন্নত হয়েছে, যেমন – পরিবর্তনযোগ্য কার্টিজ (Cartridge) এবং কনভার্টার (Converter) পদ্ধতি চালু হয়েছে।
৫। বলপয়েন্ট পেন (The Ballpoint Pen)
ফাউন্টেন পেনের অসুবিধা দূর করতে ২০শ শতকের মাঝামাঝি বলপয়েন্ট কলম বাজারে আসে। এর উদ্ভাবক ছিলেন হাঙ্গেরিয়ান সাংবাদিক লাজলো বিরো (Laszlo Biro)।
✪ কার্যপদ্ধতি: এর ডগায় একটি ছোট ধাতব বল (Ball) থাকে। লেখার সময় এই বলটি ঘুরে আসে এবং আঠালো (Viscous) কালি আধার থেকে টেনে এনে কাগজে লাগিয়ে দেয়।
✪ জনপ্রিয়তা: এর কালি দ্রুত শুকিয়ে যায়, এটি সহজে লিক করে না এবং দামে সস্তা—এই কারণে এটি বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখার যন্ত্র হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুন:
❒ বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর হাতে বিশ্ব স্বাস্থ্যের সমাধান
❒ আলো থেকে ছবিতে: ক্যামেরা আবিষ্কারের বিস্ময়কর ইতিহাস
❒ রেডিওর রহস্যভেদ: বাতাসে ভেসে আসা শব্দের ইতিহাস
❒ আলেকজান্ডার ফ্লেমিং: অ্যান্টিবায়োটিকের মহানায়ক
❒ ফিঙ্গারপ্রিন্টের আবিষ্কারক বাংলাদেশী আজিজুল হক
❒ ফ্রিজ বা রেফ্রিজারেটর: খাদ্য সংরক্ষণে এক যুগান্তকারী আবিষ্কার
৬। আধুনিক অন্যান্য কলম (Other Modern Pens)
বলপয়েন্ট কলমের পর আরও বেশ কিছু নতুন প্রযুক্তির কলম বাজারে এসেছে:
✪ রোলারবল পেন (Rollerball Pen): এটি বলপয়েন্টের মতোই, কিন্তু এতে তরল (Liquid) বা জেল (Gel) কালি ব্যবহার করা হয়। ফলে লেখা হয় আরও মসৃণ ও উজ্জ্বল।
✪ ফেল্ট-টিপ বা মার্কার (Felt-tip/Marker): এতে সিনথেটিক ফাইবার দিয়ে তৈরি টিপ ব্যবহার করা হয়, যা দিয়ে উজ্জ্বল ও গাঢ় রঙে লেখা যায়।
✪ স্টাইলাস (Stylus) ফর ডিজিটাল স্ক্রিন: আধুনিক যুগে কাগজে লেখার পাশাপাশি টাচস্ক্রিন ডিভাইসে লেখার জন্য ইলেকট্রনিক স্টাইলাস কলম ফিরে এসেছে, যা এক অর্থে প্রাচীন স্টাইলাসের ডিজিটাল সংস্করণ।
কলমের এই দীর্ঘ বিবর্তন আমাদের প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তির যত উন্নতিই হোক না কেন, মানুষের যোগাযোগ ও সৃজনশীলতার প্রাথমিক প্রয়োজন মেটাতে লেখার যন্ত্রের ভূমিকা সবসময়ই অপরিসীম।
❑ আবিষ্কার ও আবিষ্কারক থেকে আরও পড়ুন
আরও পড়ুন: আয়নার আয়নায় ইতিহাস: প্রতিফলনের পথ ধরে হাজার বছরের যাত্রা

