আইসিটি ওয়ার্ড নিউজ ডেস্ক: শবে কদর যখন যেভাবে তালাশ করবেন । পবিত্র রমজানে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত হলো শবে কদর বা লাইলাতুল কদর তালাশ করা। শবে কদর তালাশে নবীজি পুরো রমজানেই ইবাদতে আত্মমগ্ন থাকতেন। দ্বিতীয় দশকে ইবাদতের মাত্রা বাড়িয়ে দিতেন। শেষ দশকে নবীজির ইবাদতের মাত্রা আরও বেড়ে যেত।
হাদিসে দেখা যায়, কখনও তিনি দ্বিতীয় দশকেও ইতেকাফ করেছেন। এমনকি শুরুর দিকে শবে কদর পাওয়ার আশায় রমজানের প্রথম দশকেও ইতেকাফ করেছেন।
হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (স.) রমজানের প্রথম ১০ দিন ইতেকাফ করেছেন। অতঃপর মধ্যবর্তী ১০ দিন ইতেকাফ করেছেন। অতঃপর তিনি বলেন, আমি লাইলাতুল কদরের তালাশে ইতেকাফ করেছি। আমাকে বলা হলো, লাইলাতুল কদর রমজানের শেষ দশকে। অতএব, কেউ ইতেকাফ করতে চাইলে সে ইতেকাফ (শেষ দশকে) করতে পারে। ফলে লোকজন তাঁর সঙ্গে ইতেকাফ করল। (মুসনাদে আহমদ: ১১৭০৪)
আবদুল্লাহ বিন উনাইস (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (স.)-কে লাইলাতুল কদর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করি। তিনি বলেন, আমি লাইলাতুল কদর দেখেছি, অতঃপর আমাকে তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। অতএব, তোমরা রমজানের শেষ অর্ধেকে তালাশ করো। (শরহু মাআনিল আসার: ৩/৮৮)
আরও পড়ুনঃ রমজানে যেসব কাজের সওয়াব বেশি
অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, রমজানের ১৭ তারিখ রাতে লাইলাতুল কদর তালাশ করো। (সুনানে আবি দাউদ: ১৩৮৪)
প্রাজ্ঞ আলেমরা বলেন, লাইলাতুল কদরের দিনের সকাল বদরের দিনের সকালের মতোই। আর সিরাত ও মাগাজি বিশেষজ্ঞদের প্রসিদ্ধ মতানুসারে বদরের রাত ছিল ১৭ রমজান এবং দিনটি জুমার দিন ছিল। জায়িদ বিন সাবিত (রা.) ১৭ রমজানের মতো অন্যরাতে এত বেশি জেগে থাকতেন না। তিনি বলতেন, আল্লাহ বদরের দিন সকালে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য স্পষ্ট করেছেন এবং কাফির নেতাদেরকে সেদিন সকালে চরমভাবে লাঞ্ছিত করেছেন।
উল্লেখিত হাদিস ও বর্ণনাগুলো দ্বারা প্রমাণিত রমজানের মধ্যবর্তী দশকও ইবাদত-বন্দেগি ও আল্লাহমুখী হওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব রাখে।
তবে, লাইলাতুল কদর তালাশে রমজানের শেষ দশকই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (স.) রমজানের শেষ দশকে ইতেকাফ করতেন এবং বলতেন, তোমরা শেষ দশকে লাইলাতুল কদর তালাশ কর।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৬৫)
আরও পড়ুনঃ ইফতারের সময় যে আমলের কথা ভুলবেন না
আবু বাকরা (রা.)-এর কাছে একবার লাইলাতুল কদর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো। তিনি বললেন, আমি লাইলাতুল কদর রমজানের শেষ দশ দিন ছাড়া অন্যকোনো রাতে অনুসন্ধান করব না। রাসুলুল্লাহ (স.)-কে বলতে শুনেছি যে, তোমরা এ রাতটিকে রমজানের নয় দিন বাকী থাকতে বা সাতদিন বাকী থাকতে বা পাঁচ দিন বাকী থাকতে বা তিন দিন বাকী থাকতে বা এর শেষ রাতে অনুসন্ধান কর।
বর্ণনাকারী বলেন, আবু বাকরা (রা.) রমজানের বিশ দিন পর্যন্ত অন্যান্য সুন্নতের মতোই সালাত আদায় করতেন। কিন্তু শেষ দশ দিনের ক্ষেত্রে খুবই প্রচেষ্টা চালাতেন। (তিরমিজি: ৭৯৪; ইবসে হিব্বান; ৩৬৮৬)
হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণিত আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমরা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে লাইলাতুল কদরের সন্ধান কর।’ (সহিহ বুখারি: ২০১৭, সহিহ মুসলিম: ১১৬৯)
সালিম (রহ) তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি (পিতা) বলেন, ‘এক ব্যক্তি (রমজানের) ২৭তম রাতে লাইলাতুল কদর দেখতে পেল। নবী (স.) বললেন, আমাকেও তোমাদের মতো স্বপ্ন দেখানো হয়েছে যে, তা রমজানের শেষ দশকে নিহিত আছে। অতএব, এর বিজোড় রাতগুলোতে তা অনুসন্ধান কর।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৬৫)
আরও পড়ুনঃ মহান আল্লাহর কাছে প্রকৃত রোজাদারের মর্যাদা
মহাগ্রন্থ কোরআনুল কারিম নাজিল হয়েছে লাইলাতুল কদরে। এ রাতের মর্যাদা সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আমি একে নাজিল করেছি মহিমান্বিত রাতে (লাইলাতুল কদর)। আপনি কি জানেন মহিমান্বিত রাত কী? মহিমান্বিত রাত হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। সেই রাতে প্রতিটি কাজের জন্য ফেরেশতারা এবং রুহ তাদের প্রতিপালকের আদেশক্রমে অবতীর্ণ হয়। সেই রাতে শান্তিই শান্তি, ফজর হওয়া পর্যন্ত।’ (সুরা কদর: ১-৫)
প্রিয়নবী (স.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় কদরের রাতে ইবাদতের মধ্যে রাত জাগবে, তার আগের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে’ (সহিহ বুখারি: ৩৫)
মহানবী (স.) নির্দিষ্ট করে শবে কদরের তারিখ উল্লেখ করেননি। অবশ্য শবে কদরের রাত চেনার বেশ কিছু আলামতের কথা তিনি বলেছেন। এরকম উল্লেখযোগ্য একটি হাদিস হলো- আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে নবী (স.) বলেছেন, ‘ওই রাতের আলামত বা লক্ষণ হলো, রাত শেষে সকালে সূর্য উদিত হবে তা উজ্জ্বল হবে। তবে উদয়ের সময় তার কোনো তীব্র আলোকরশ্মি থাকবে না (অর্থাৎ দিনের তুলনায় কিছুটা নিষ্প্রভ হবে)। (মুসলিম: ১৬৭০; ইসলামিক ফাউন্ডেশন: ১৬৫৫)
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) বর্ণিত অন্য হাদিসে নবী (স.) বলেছেন, ‘লাইলাতুল কদরের রাতটি হবে প্রফুল্লময়। না গরম, না ঠাণ্ডা। সেদিন সূর্য উঠবে লালবর্ণে, তবে দুর্বল থাকবে।’ (ইবনু খুজাইমাহ: ২১৯২)
শবে কদরের আলামত সংক্রান্ত আরও কিছু হাদিস রয়েছে। যেমন এক হাদিসে এসেছে, ‘লাইলাতুল কদরের আলামত হচ্ছে, স্বচ্ছ রাত, যে রাতে চাঁদ উজ্জ্বল হবে, আবহাওয়ায় প্রশান্তি (সাকিনাহ) থাকবে। না ঠাণ্ডা, না গরম। সকাল পর্যন্ত (আকাশে) কোনো উল্কাপিণ্ড দেখা যাবে না। সে রাতের চাঁদের মতোই সূর্য উঠবে (তীব্র) আলোকরশ্মি ছাড়া। শয়তান সেই সময় বের হয় না।’ (মুসনাদ আহমদ: ২২৭৬৫)
আরও পড়ুনঃ কেয়ামতের দিন রোজার প্রতিদান আল্লাহ নিজেই দিবেন
এ সম্পর্কিত আরও একটি হাদিস হলো- ‘লাইলাতুল কদর উজ্জ্বল একটি রাত। না গরম, না ঠাণ্ডা। সে রাতে কোনো উল্কাপিণ্ড দেখা যাবে না।’ (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ : ৩/১৭৯; সহিহ আল-জামে: ৫৪৭২)
অন্য হাদিসে নবী (স.) বলেছেন, ‘লাইলাতুল কদর রয়েছে সপ্তম, নবম অথবা বিংশ, যে রাতে (পৃথিবীর) নুড়ি পাথরের চেয়ে বেশি সংখ্যক ফেরেশতা জমিনে নেমে আসে।’ (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ: ৩/১৭৮; সহিহ আল-জামে: ৫৪৭৩)
এছাড়াও বিভিন্ন বর্ণনায় শবে কদরের আরও কিছু আলামতের উল্লেখ রয়েছে, যেমন মৃদুবাতাস বইবে গোটা রাতজুড়ে, সে রাতের ইবাদতে মানুষ বেশি তৃপ্তি পাবে, ওই রাতে বৃষ্টি বর্ষণও হতে পারে ইত্যাদি। আবার ওই রাতটি সম্পর্কে কোনো বান্দাকে আল্লাহ ইলহাম করতে পারেন বা স্বপ্নে জানিয়েও দিতে পারেন।
আল্লাহ সবাইকে রমজানের বরকত ও মর্যাদা হাসিলের তাওফিক দান করুন। এখন থেকে শবে কদর অনুসন্ধানের চেষ্টা করার তাওফিক দান করুন। সর্বোপরি লাইলাতুল কদর নসিব করুন। আমীন।
আরও পড়ুনঃ জুমার দিনে অন্তত তিনটি আমল ছাড়বেন না


