আইসিটি ওয়ার্ড নিউজ: মজার ছলে মিথ্যা বলছেন? নবীজির (সা.) কঠিন পরিণতির হুঁশিয়ারি । আমরা অনেক সময় মনে করি, কেবল বড় কোনো জালিয়াতি বা ধোঁকাবাজিই হলো মিথ্যা। কিন্তু ছোটখাটো কথায় সত্য গোপন করা বা অতিরঞ্জিত করাকেও ইসলামে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।
ইসলাম সত্যবাদিতাকে ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং মিথ্যাকে সব ধরনের পাপের মূল হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। পবিত্র কোরআনে মিথ্যাবাদীদের ওপর আল্লাহর অভিশাপের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সুরা আলে ইমরানে ইরশাদ হয়েছে, ‘মিথ্যুকদের ওপর আল্লাহর লানত পতিত হোক।’ (আয়াত: ৬১) অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অনুমানভিত্তিক মিথ্যাচারীরা ধ্বংস হোক।’ (সুরা জারিয়াত: ১০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) মিথ্যার ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে উম্মতকে বারবার সতর্ক করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ‘নিশ্চয়ই কোনো ব্যক্তি মিথ্যায় রত থাকলে পরিশেষে মিথ্যাবাদী হিসেবেই (তার নাম) লিপিবদ্ধ করা হয়।’ (সহিহ মুসলিম: ২৬০৭)
আমাদের সমাজে এমন বহু মিথ্যা রয়েছে, যেগুলোকে আমরা অনেক সময় মিথ্যা বলেই গণ্য করি না। অথচ এসব বিষয়েই হাদিসে এসেছে কঠোর হুঁশিয়ারি। নবীজি (সা.)-এর হাদিসের আলোকে এমন কিছু ভয়াবহ মিথ্যা নিচে তুলে ধরা হলো-
১. মানুষকে হাসাতে মিথ্যা বলা
বন্ধুমহলে আড্ডা জমাতে কিংবা কাউকে হাসাতে গিয়ে অনেকে মিথ্যা গল্পের আশ্রয় নেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) এই বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেন:
“ধ্বংস তার জন্য, যে মানুষকে হাসানোর জন্য কথা বলে এবং তাতে মিথ্যার আশ্রয় নেয়। তার জন্য ধ্বংস, তার জন্য ধ্বংস।” — (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ৪৯৯০; তিরমিজি)
২. ছোটদের সাথে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি
বাচ্চাদের শান্ত করতে বা ভোলানোর জন্য আমরা অনেক সময় বলি—‘চুপ করো, তোমাকে চকলেট দেব’ বা ‘এটা করো, ওটা দেব’। কিন্তু পরে তা না দিলে সেটিও মিথ্যা হিসেবে গণ্য হবে। আব্দুল্লাহ ইবনে আমির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) এক মাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, যদি তুমি তাকে কিছু (প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী) না দাও, তবে তোমার আমলনামায় একটি মিথ্যা লেখা হবে। — (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ৪৯৯১)
৩. অতিরঞ্জিত করা বা বাড়িয়ে বলা
গল্প করার সময় ঘটনাকে আরও মুখরোচক করতে আমরা কিছু কথা বাড়িয়ে বলি। এটিও মিথ্যারই একটি রূপ। মুমিনের গুণ হলো সে যা দেখবে বা শুনবে, ঠিক ততটুকুই বলবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে (যাচাই না করে) তাই বলে বেড়ায়।” — (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ৫)
৪. ব্যবসার ক্ষেত্রে মিথ্যা শপথ
পণ্য বিক্রির সময় অনেকে তুচ্ছ স্বার্থে কসম কাটেন বা পণ্যের ত্রুটি গোপন করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মিথ্যা শপথের মাধ্যমে পণ্য তো বিক্রি হয়, কিন্তু এতে বরকত চলে যায়। — (সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ২০৮৭)
৫. যাচাই-বাছাই ছাড়া তথ্য প্রচার
বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে যাচাই না করেই শোনা কথা প্রচার করা খুব সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অথচ সত্যতা নিশ্চিত না করে কোনো কথা ছড়িয়ে দেওয়া ইসলামে মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কারো মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে (যাচাই ছাড়াই) তাই প্রচার করতে থাকে।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৯২)
৬. অসত্য সংবাদ ও গুজব ছড়ানো
মিথ্যা সংবাদ বা গুজব সমাজে ছড়িয়ে দেওয়ার শাস্তি অত্যন্ত ভয়াবহ। মেরাজের রাতে নবীজি (সা.)-কে এমন এক ব্যক্তির শাস্তি দেখানো হয়, যার চোয়াল লোহার পেরেক দিয়ে বিদীর্ণ করে ঘাড় পর্যন্ত টেনে নেওয়া হচ্ছিল। জিবরাইল (আ.) জানান, ‘এ ব্যক্তি ছিল মিথ্যাবাদী। সে এমন মিথ্যা বলত, যা তার কাছ থেকে ছড়িয়ে দিগদিগন্তে পৌঁছে যেত।’ (সহিহ বুখারি: ১৩৮৬)
৭. স্বপ্ন নিয়ে মিথ্যাচার
গুরুত্ব বা সম্মান পাওয়ার আশায় অনেকে মিথ্যা স্বপ্নের কথা বলেন। নবীজি (সা.) একে বড় ধরনের মিথ্যা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি স্বপ্ন দেখেনি অথচ দেখার দাবি করল, কেয়ামতের দিন তাকে দুটি যব একত্রে জোড়া দিতে বাধ্য করা হবে, যা সে কখনোই করতে পারবে না।’ (সহিহ বুখারি: ৭০৪২)
৮. অহেতুক ধারণা ও কুধারণা
ভিত্তিহীন নেতিবাচক ধারণাও মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত। নবীজি (স.) বলেন, ‘ধারণা-অনুমান থেকে বেঁচে থাকো। কারণ অলীক ধারণাই সবচেয়ে বড় মিথ্যা।’ (সহিহ বুখারি: ৬০৬৬)
আরও পড়ুন:
❒ জান্নাতের ৮টি দরজাই খোলা থাকবে যে নারীদের জন্য
❒ জিনের কুপ্রভাব থেকে ঘর সুরক্ষিত রাখতে যা বর্জন করবেন
❒ ইসলামিক বিয়ের সঠিক নিয়ম: যেভাবে সুন্নত মেনে সম্পন্ন করবেন আকদ
❒ জান্নাতের ৮ দরজার চাবি: অজুর পরে যে দোয়াটি অবশ্যই পাঠ করবেন
❒ অহংকারী কেন নিজের ভুল দেখতে অক্ষম, কোরআন ও হাদিসের আলোকে বিশ্লেষণ
❒ আল্লাহর ফয়সালার উপর ভরসা রাখলে যে ৫ কল্যাণ মেলে
৯. প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ মুনাফেকির আলামত
ওয়াদা দিয়ে তা রক্ষা না করাকে নবীজি (সা.) মুনাফেকির অন্যতম নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি: কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে এবং আমানত রাখা হলে খেয়ানত করে।’ (সহিহ বুখারি: ৩৩)
মিথ্যা কেবল ব্যক্তিগত পাপ নয়; এটি সমাজ, বিশ্বাস ও আত্মিক পরিশুদ্ধির বড় অন্তরায়। সত্যবাদিতা মানুষকে জান্নাতের পথে পরিচালিত করে, আর মিথ্যা তাকে ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করে। নবীজি (সা.)-এর এসব কঠিন হুঁশিয়ারি অন্তরে ধারণ করে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, ছোট হোক বা বড়- মিথ্যা বর্জন করাই একজন মুমিনের প্রকৃত পরিচয়।
তথ্যসূত্র: সুনানে আবু দাউদ, সহীহ মুসলিম, সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ
❑ ইসলামী জীবন থেকে আরও পড়ুন
আরও পড়ুন: উপহাস ও বিদ্রূপ: পরকালের পুঁজি হারানোর এক নীরব ঘাতক

