আইসিটি ওয়ার্ড নিউজ ডেস্ক: ভারতে ‘মগজখেকো’ অ্যামিবার হানা! সতর্কতা জারি । ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কেরলায় ‘ব্রেইন-ইটিং’ অ্যামিবা হিসেবে পরিচিত Naegleria fowleri–র সংক্রমণ বৃদ্ধির খবর আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি করেছে। ২০২৫ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী বছরের শুরু থেকে রাজ্যে প্রাথমিক অ্যামেবিক মেনিনজোএনসেফালাইটিস (Primary Amoebic Meningoencephalitis — PAM)–এর বহু কেস পাওয়া গেছে এবং প্রাণহানিও ঘটেছে। কেরলায় একাধিক সূত্রে বলা হচ্ছে, এই বছরেরই মধ্যে কয়েকদশ কেস শনাক্ত হয়েছে এবং মৃত্যু হয়েছে কয়েকজনের।
Naegleria fowleri একধরনের মুক্ত-জীবিত অ্যামিবা, যা সাধারণত গরম তাজা পানিতে (লেক, পুকুর, নদী ও অনুৎকৃষ্টভাবে চিকিত্সা করা সুইমিং পুল) বাস করে। এই অণুজীব নাকের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে মস্তিষ্কে পৌঁছে সেখানকার টিস্যু নষ্ট করে দেয়—ফলশ্রুতিতে রোগীকে দ্রুত এনারিয়ার মতো গুরুতর নিউরোলজিক্যাল অবস্থা দেখা দেয়। রোগটি খুব দ্রুত অগ্রসর হয় এবং ফ্যাটালিটি রেট প্রচণ্ড উচ্চ; তাই দ্রুত সনাক্তকরণ ও ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি।
Naegleria fowleri–জনিত PAM–এর প্রাথমিক লক্ষণ সাধারণ সর্দি-জ্বরের মতো: মাথা ব্যথা, জ্বর, বমি, বমি মিশ্রিত তীব্র মাথাব্যথা এবং ঘাড়ের কড়াকড়ি। এরপর দ্রুত নিউরোলজিক্যাল সমস্যা—মনোবৈকল্য, সিজার, শঙ্কু ও কোমা—দেখা দিতে পারে। এসব উপসর্গ দেখা মাত্রই চিকিৎসা নিতে বলছে বিশেষজ্ঞরা, কারণ বাকি সময় প্রায়ই খুবই সীমিত।
কেরলায় সরকারি ও গণমাধ্যম রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজ্যে PAM–এর নির্দিষ্ট কেস রিপোর্ট হয়েছে; স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক বক্তব্যে উল্লেখ আছে কয়েক ডজন কেস এবং কয়েকজনের মৃত্যু। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বছরের নির্দিষ্ট কেস সংখ্যা ৬০–৭০–এর সীমায় এবং মৃত্যু ১৯–এর কাছাকাছি। রাজ্য সরকারের রোগতত্ত্ব ইউনিট বিশেষ নজরদারি চালাচ্ছে এবং বিস্তৃত টেস্টিং ও সচেতনতামূলক প্রচার শুরু করেছে। একই সঙ্গে রাজ্য বিধায়ক মণ্ডলীতেও এই বিষয় নিয়ে প্রশ্নোত্তর ও তৎপরতা দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া, পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বাইরে খোলা, অপরিষ্কার freshwater–এ মানুষের বেশি সময় কাটানো—এসব মিলিত কারণ সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এছাড়া গৃহস্থালী ব্যবহার যেমন নাসাল ইরিগেশনে (neti pot) অপরিচ্ছন্ন জলে চুলা করা বা টেপ-ট্যাপ পানি ব্যবহার করলে ঝুঁকি বাড়ে—এই সতর্কতাও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলি বারবার জানিয়েছে। ভারতীয় খবরে neti pot–সংক্রান্ত সতর্কতা বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
PAM–এর চিকিৎসা চ্যালেঞ্জিং: বিশ্বব্যাপী বাঁচার হার অত্যন্ত নিম্ন। দ্রুত শুরু করা শক্তিশালী অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ও অ্যান্টিমাইবিক কোর্স—কিছু ক্ষেত্রে মিলটেফোসিন (miltefosine) যুক্ত করা—কিছু রোগীর জীবন রক্ষায় সহায়ক হয়েছে; কেরলায়ও কিছু সফলতা এবং আগের তুলনায় বাঁচার হার কিছু উন্নত রিপোর্ট করা হয়েছে, তবে রোগের দ্রুতগতির কারণে সামগ্রিকভাবে চিকিৎসা কঠিন। স্থানীয় হাসপাতাল ও আইসিইউ ক্ষমতা বাড়ানো, রেপিড ডায়াগনস্টিক এবং তাত্ক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়াই মূল চাবিকাঠি।
সরকারি ও বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলি যে প্রতিরোধমূলক পরামর্শ দিচ্ছে তা কার্যকর ও বাস্তবসম্মত: ১) গরম তাজা পানিতে সাঁতার না কাটা বা আগ্রহ হলে Nose clip/নাক-সুরক্ষা ব্যবহার করা; ২) ব্যক্তিগত নাসাল ইরিগেশনে (neti pot বা নাসাল স্লাড) ব্যবহারযোগ্য জলে—বিশুদ্ধ, স্টেরাইল বা আগে থেকে ভালোভাবে ফোটানো পানি ব্যবহার করা; ৩) সুইমিং পুলগুলোতে সঠিক ক্লোরিনেশন বজায় রাখা; ৪) সংক্ষিপ্ত মাথাব্যথা বা জ্বর–ঘাবড়া হলে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করা। স্থানীয় প্রশাসনকে খোলা জলাশয়ে পাবলিক সতর্কবার্তা/নোটিশ টাঙানো, পানির মান নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ বাড়াতে বলা হচ্ছে।
কেরলা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যেই উচ্চ সতর্কতা জারি করেছে, রাজ্যব্যাপী পরীক্ষার পরিমাণ বাড়ানো এবং চিকিৎসা কেন্দ্রগুলিকে নির্দেশ দিয়েছে যাতে PAM–সংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজন রোগী দ্রুত শনাক্ত ও স্থানান্তর করা যায়। একই সঙ্গে রাজ্য সরকারের তহবিল ও বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন সম্পর্কে সংবাদায়ন হয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য দফতরও রাজ্যকে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে—বিশেষত দ্রুত ডায়াগনস্টিক ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল স্টক নিশ্চিতকরণে।
আরও পড়ুন:
❒ ভারতের আইনে পরিণত হলো বিতর্কিত ওয়াকফ সংশোধনী বিল
❒ বিশ্বের বর্তমান জনসংখ্যা ৮০৯ কোটি
❒ গাজায় নির্মম হত্যাযজ্ঞের শেষ কোথায়?
সতর্ক বার্তা: গুজব ও অতিরিক্ত আতঙ্ক প্রতিরোধ
এই সময়ে সঠিক তথ্যই জনস্বাস্থ্য প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। ভুল খবর বা অতিরিক্ত ভূয়া তথ্য দ্রুত ছড়ালে জনজীবনে অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক তৈরি হবে। এজন্য স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে সময়োপযোগী, স্পষ্ট এবং বহুভাষিক বার্তা প্রচার করতে হবে—কিভাবে নিরাপদ থাকা যায়, কোথায় শঙ্কা হলে যোগাযোগ করতে হবে এবং কোথায় জলসম্পদগুলো মান নিয়ন্ত্রণ করতে হবে তা জানাতে হবে।
কেরলায় Naegleria fowleri–এর প্রদর্শিত বর্তমান প্রবণতা হঠাৎ দেখাচ্ছে যে বিরল হলেও প্রাণঘাতী সংক্রমণ পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতাকে প্রকাশ করে। ব্যক্তি পরিমন্ডলে সতর্কতা, স্বাস্থ্যসেবায় প্রস্তুতি, জলাশয়ের মান নিয়ন্ত্রণ ও দ্রুত রিপোর্টিং সিস্টেম—এসব একসঙ্গে না থাকলে বিপর্যয় বাড়তে পারে। সাধারণ মানুষকে নির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত সাবধানতা মেনে চলতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত, স্বচ্ছ ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
❑ আন্তর্জাতিক থেকে আরও পড়ুন
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আধুনিক মারণাস্ত্রের ভাণ্ডার

