আইসিটি ওয়ার্ড নিউজ: চাঁদের দৌড়: মহাকাশে আধিপত্য নিয়ে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের স্নায়ুযুদ্ধ । বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে মহাকাশ জয় নিয়ে যে রেষারেষি শুরু হয়েছিল, একবিংশ শতাব্দীতে তা ফিরে এসেছে নতুন আঙ্গিকে। এবার প্রতিপক্ষ চীন, যারা মহাকাশ গবেষণায় অভাবনীয় অগ্রগতি অর্জন করেছে। চাঁদকে কেন্দ্র করে এই দুই পরাশক্তির মধ্যে যে অলিখিত প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, তা কেবল বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান নয়, বরং মহাকাশে অর্থনৈতিক ও সামরিক আধিপত্য বিস্তারের এক নতুন স্নায়ুযুদ্ধের ইঙ্গিত বহন করে।
চাঁদ দখলে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হয়েছে নতুন মহাকাশ স্নায়ুযুদ্ধ। আর্টেমিস মিশন এবং চীনা প্রোগ্রামের লক্ষ্য, প্রভাব ও প্রতিযোগিতার কারণ জানুন।
আধিপত্যের কেন্দ্রবিন্দু চাঁদ
চাঁদ এখন শুধু বৈজ্ঞানিক গবেষণার লক্ষ্য নয়, এটি কৌশলগত গুরুত্বের কারণে ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ভবিষ্যতে মহাকাশ অনুসন্ধান এবং গভীর মহাকাশ অভিযানের জন্য চাঁদকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি (Gateway) হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষত চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে বরফের আকারে জল (Water Ice) থাকার সম্ভাবনা আবিষ্কার হওয়ার পর এই প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়েছে। এই জল শুধু পানীয় জলের উৎস নয়, রকেটের জ্বালানি (Liquid Oxygen and Hydrogen) তৈরির কাজেও ব্যবহার করা যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘আর্টেমিস’ মিশন (Artemis Mission)
মহাকাশে নিজেদের নেতৃত্ব পুনরুদ্ধার এবং চাঁদে মানুষের স্থায়ী উপস্থিতি নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র নাসা (NASA)-র মাধ্যমে ‘আর্টেমিস’ প্রোগ্রাম শুরু করেছে। এই মিশনের প্রধান লক্ষ্য হলো ২০২৫ সালের মধ্যে প্রথম নারী এবং পরবর্তী পুরুষ নভোচারীকে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে নামানো। এর পাশাপাশি, আর্টেমিস অ্যাকর্ডসের মাধ্যমে মহাকাশ শাসনের একটি কাঠামো তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্র এই ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও নিয়মকানুন নিজেদের অনুকূলে রাখতে চাইছে। এই চুক্তিটি মহাকাশ অভিযানের ক্ষেত্রে উন্মুক্ততা, শান্তি এবং স্বচ্ছতার ওপর জোর দেয়।
চীনের ‘তাংগং’ এবং চ্যাঙ্গ’ই প্রোগ্রাম (Tiangong and Chang’e Program)
অন্যদিকে, চীন নিজস্ব মহাকাশ স্টেশন ‘তাংগং’ (Tiangong) নির্মাণ সম্পন্ন করেছে এবং চাঁদে একাধিক সফল রোবোটিক মিশন ‘চ্যাঙ্গ’ই’ (Chang’e) পরিচালনা করেছে। চীনের লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষ পাঠানো এবং রাশিয়াকে সাথে নিয়ে চাঁদের পৃষ্ঠে একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্র (International Lunar Research Station – ILRS) স্থাপন করা। চীনের এই দ্রুত এবং সুসংগঠিত কর্মসূচি পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য স্পষ্ট চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তারা মহাকাশ প্রযুক্তিতে দ্রুত স্বনির্ভরতা অর্জন করছে।
স্নায়ুযুদ্ধের নতুন মাত্রা
এই প্রতিযোগিতা শুধু চাঁদ ছোঁয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর পেছনে রয়েছে গভীর কৌশলগত কারণ:
প্রযুক্তিগত প্রাধান্য: মহাকাশ প্রযুক্তি, বিশেষত স্যাটেলাইট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং দূর-নিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তিতে কে এগিয়ে থাকবে, তা নিয়ে এই লড়াই।
অর্থনৈতিক সুযোগ: চাঁদের সম্পদ কাজে লাগানো এবং মহাকাশ অর্থনীতির (Space Economy) ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
সামরিক উদ্বেগ: যদিও উভয় দেশই শান্তিপূর্ণ মহাকাশ অনুসন্ধানের কথা বলে, তবুও একে অপরের উপর নজরদারি এবং মহাকাশে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্বেগ বিদ্যমান।
আরও পড়ুন:
❒ চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি বানাতে চায় নাসা
❒ চাঁদেই পানি সংগ্রহের মিশনে বিজ্ঞানীরা
❒ চাঁদে বসবাস আগের ধারণার চেয়েও সহজ হতে পারে!
❒ চাঁদে অক্সিজেন তৈরির চেষ্টা
❒ চাঁদে সক্রিয় আগ্নেয়গিরির অস্তিত্ব ছিল
❒ চাঁদে যাচ্ছে ইউরোপের প্রথম রোভার যান ‘টেনাশিয়াস’
নাসার প্রধান বিল নেলসন সরাসরি সতর্ক করেছেন যে চীন সামরিক উদ্দেশ্যে মহাকাশ ব্যবহার করতে পারে এবং চাঁদের কিছু অংশ ‘দখল’ করতে পারে, যেমনটা তারা দক্ষিণ চীন সাগরে করেছে। যদিও চীন এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মহাকাশের এই প্রতিযোগিতা মানবজাতির জন্য একই সঙ্গে অনুপ্রেরণা এবং উদ্বেগের কারণ। একদিকে এটি মহাকাশ গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে, অন্যদিকে দুটি পরাশক্তির এই রেষারেষি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পথকে জটিল করে তুলছে। চাঁদের দখল বা সেখানে কে প্রথম এবং সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করবে, তা-ই হয়তো নির্ধারণ করবে আগামী কয়েক দশকের বিশ্ব এবং মহাকাশ শক্তির ভারসাম্য।
সূত্র: নাসা (NASA) এবং চাইনিজ ন্যাশনাল স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (CNSA)-এর অফিশিয়াল ঘোষণা, আর্টেমিস অ্যাকর্ডস সংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্য, আন্তর্জাতিক মহাকাশ নীতি বিষয়ক গবেষণা প্রতিবেদন
❑ মহাকাশ ও বিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
আরও পড়ুন: চাঁদের দক্ষিণ মেরু নিয়ে বৈজ্ঞানিক কৌতূহল কেন বাড়ছে?

