আইসিটি ওয়ার্ড নিউজ: চুম্বক কীভাবে কাজ করে? অদৃশ্য টানের রহস্য । কোনো স্পর্শ ছাড়াই একটি লোহাকে টেনে নেওয়া বা ফ্রিজের গায়ে স্টিকার আটকে থাকা—চুম্বকের এই অদ্ভুত ক্ষমতা আমাদের আজীবন মুগ্ধ করে। কিন্তু এই অদৃশ্য শক্তির উৎস আসলে কোথায়? বিজ্ঞান বলছে, এর উত্তর লুকিয়ে আছে পদার্থের ক্ষুদ্রতম একক পরমাণুর ভেতরে। কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছেন, চুম্বক আসলে কীভাবে কাজ করে?
চুম্বক কীভাবে লোহাকে টানে? জানুন ইলেকট্রনের ঘূর্ণন আর চৌম্বক ক্ষেত্রের সেই অদৃশ্য রহস্য যা বিজ্ঞানকে করেছে আরও রোমাঞ্চকর।
চুম্বক কী?
চুম্বক এমন একটি বস্তু, যার চারপাশে এক ধরনের বল বিদ্যমান থাকে—যাকে চৌম্বক ক্ষেত্র (Magnetic Field) বলা হয়। এই বলই চুম্বকের কাছাকাছি থাকা কিছু নির্দিষ্ট পদার্থকে আকর্ষণ করে, যেমন: লোহা (Iron), নিকেল (Nickel), কোলবাল্ট (Cobalt)।
ইলেকট্রনের ঘূর্ণন ও চুম্বকত্ব
প্রতিটি পদার্থের ভেতরে থাকে কোটি কোটি পরমাণু, আর পরমাণুর চারদিকে ঘোরে ইলেকট্রন। এই ইলেকট্রনগুলো যখন নিজের অক্ষের ওপর লাটিমের মতো ঘোরে (Spin), তখন তারা একেকটি ক্ষুদ্র চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে। সাধারণ বস্তুতে এই ইলেকট্রনগুলো অগোছালোভাবে থাকে, ফলে তাদের চৌম্বক শক্তি একে অপরকে বাতিল করে দেয়। কিন্তু চুম্বকের ক্ষেত্রে ইলেকট্রনগুলো সব একই দিকে সাজানো থাকে, যা মিলিতভাবে একটি শক্তিশালী বল তৈরি করে।
চৌম্বকত্ব কোথা থেকে আসে?
চৌম্বকত্ব আসে পরমাণুর ভেতরের ইলেকট্রনের ঘূর্ণন ও গতি থেকে। সাধারণত পরমাণুর ইলেকট্রনরা বিভিন্ন দিকে ঘোরে এবং তাদের চৌম্বক বল একে অপরকে বাতিল করে দেয়। তবে কিছু পদার্থে ইলেকট্রনরা একই দিকে ঘোরে—ফলে সামষ্টিকভাবে একটি শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হয়।
এই ধরনের পদার্থকে Ferromagnetic materials বলা হয়।
চৌম্বক কিভাবে আকর্ষণ করে?
চুম্বক বস্তুটি যখন চৌম্বকযোগ্য কোনো পদার্থের কাছাকাছি আসে, তখন সেটির ইলেকট্রনগুলোকে সাময়িকভাবে সংগঠিত করে—ফলে সেটাও চুম্বকীয় আচরণ করে এবং আকর্ষিত হয়।
চৌম্বক ক্ষেত্র (Magnetic Field)
একটি চুম্বকের চারপাশে যে এলাকা পর্যন্ত তার প্রভাব থাকে, তাকে চৌম্বক ক্ষেত্র বলে। এই ক্ষেত্রটি আমাদের চোখে অদৃশ্য, কিন্তু এর ভেতরে কোনো লোহা বা অন্য চুম্বক আনলে তার টান অনুভব করা যায়। পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ মেরু যেমন আছে, প্রতিটি চুম্বকেরও তেমনি দুটি মেরু থাকে: উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরু।
আকর্ষন ও বিকর্ষন
চুম্বকের একটি সহজ নিয়ম হলো:
❆ বিপরীত মেরু আকর্ষণ করে: উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরু একে অপরকে টানে।
❆ একই মেরু বিকর্ষণ করে: দুটি উত্তর মেরু বা দুটি দক্ষিণ মেরু একে অপরকে দূরে ঠেলে দেয়।
আরও পড়ুন:
❒ লোহার টুকরো পানিতে ডুবে যায় কিন্তু জাহাজ ভাসে কেন?
❒ পানি কি সত্যিই বর্ণহীন? জানুন বিজ্ঞানের চোখে এর আসল রং!
❒ মহাকাশে কি গন্ধ আছে?
❒ কাক সাবান চুরি করে কেন নিয়ে যায়? জানুন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
❒ মহাকাশে সময় ধীরগতিতে চলে কেন?
❒ ব্ল্যাক হোল কীভাবে কাজ করে?
পৃথিবী নিজেই একটি বিশাল চুম্বক!
আপনি কি জানেন, আমাদের পৃথিবী একটি বিশাল চুম্বক হিসেবে কাজ করে? পৃথিবীর কেন্দ্রের গলিত লোহা ও নিকেলের স্রোত থেকে এই চৌম্বক শক্তির উৎপত্তি। এই শক্তির কারণেই কম্পাস সবসময় উত্তর দিক নির্দেশ করে এবং এটি আমাদের সূর্য থেকে আসা ক্ষতিকর বিকিরণ থেকেও রক্ষা করে।
বিদ্যুৎ ও চুম্বকের সম্পর্ক (Electromagnet)
চুম্বক কেবল প্রাকৃতিকভাবেই পাওয়া যায় না, বিদ্যুৎ দিয়েও চুম্বক তৈরি করা যায়। কোনো তারের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করলে তার চারপাশে একটি চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হয়। একে বলা হয় তড়িৎচুম্বক বা Electromagnet। কলিং বেল থেকে শুরু করে এমআরআই (MRI) মেশিন—সবই এই নীতিতে চলে।
চুম্বক এক বিস্ময়কর প্রাকৃতিক শক্তি, যা পারমাণবিক স্তর থেকে কাজ করে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বিশাল প্রভাব ফেলে। চৌম্বকত্ব বিজ্ঞানের এক অদ্ভুত ও অসাধারণ দিক, যার আরও গভীরে গিয়ে আমরা প্রযুক্তির অনেক দুয়ার খুলতে পারি।
তথ্যসূত্র: Britannica, National Geographic Education, Physics Today:
❑ মাথায় কত প্রশ্ন আসে থেকে আরও পড়ুন
আরও পড়ুন: বিদ্যুৎ কি সত্যিই আলো ছড়ায়? না কি আলোর পেছনের কারিগর?

