আইসিটি ওয়ার্ড নিউজ: আপনার শরীরে লুকিয়ে আছে পারমাণবিক বিস্ফোরণের অদৃশ্য চিহ্ন ! শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও, আপনার শরীরে এমন একটি উপাদান রয়েছে যা পারমাণবিক বোমার আবিষ্কারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর সেই উপাদানটির নাম—কার্বন-১৪।
পারমাণবিক বোমা ও কার্বন-১৪ এর সংযোগ
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, যখন পৃথিবী প্রথম পারমাণবিক বিস্ফোরণের মুখোমুখি হয়, তখন শুধু হিরোশিমা বা নাগাসাকিই কেঁপে ওঠেনি—কেঁপে উঠেছিল গোটা বায়ুমণ্ডল। সেই বিস্ফোরণ থেকে প্রচুর নিউট্রন ছড়িয়ে পড়ে, যা বায়ুমণ্ডলে উপস্থিত নাইট্রোজেন পরমাণুর সঙ্গে বিক্রিয়া করে তৈরি করে কার্বন-১৪ নামক তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ।
এই কার্বন-১৪ গেল কোথায়?
এই অতিরিক্ত কার্বন-১৪ বাতাসের মাধ্যমে উদ্ভিদ, প্রাণী, এমনকি মানুষের শরীরেও প্রবেশ করে। বিজ্ঞানীরা বলছেন—১৯৪৫ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত যেসব মানুষ জন্ম নিয়েছে, তাদের শরীরে রয়েছে পারমাণবিক বিস্ফোরণের সেই চিহ্ন, কারণ তারা বেড়ে উঠেছে এমন পরিবেশে, যেখানে অতিরিক্ত কার্বন-১৪ উপস্থিত ছিল।
গবেষণা
বিশেষ করে কারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের জীববিজ্ঞানী কির্সটি স্পলডিং গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, মানুষের শরীরের কোষ যেমন চর্বি কোষ বা নিউরন এর বয়স নির্ধারণ সম্ভব হয়েছে এই বম্ব স্পাইক বিশ্লেষণের মাধ্যমে। ২০১৩ সালের এক গবেষণায় স্পলডিং ও তাঁর সহকর্মীরা প্রমাণ করেন, হিপোক্যাম্পাসে প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থাতেও নতুন নিউরন জন্মায়। এই আবিষ্কার আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানে এক বিপ্লব ঘটায় এবং ভবিষ্যতের থেরাপিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
ফরেনসিক বিজ্ঞানেও এই পদ্ধতির সফল ব্যবহার ঘটেছে। ২০১০ সালে ইতালির এক লেকে পাওয়া মৃতদেহের বয়স নির্ধারণে বম্ব স্পাইক বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আবার, ২০০৪ সালে ইউক্রেনের একটি গণকবরে পাওয়া চুলের নমুনা পরীক্ষা করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিদের এক যুদ্ধাপরাধের সময়কাল নির্ধারণ সম্ভব হয়।
বম্ব স্পাইক শুধু মানুষের ক্ষেত্রেই নয়, অন্যান্য গবেষণাতেও বিস্ময়করভাবে সহায়ক। অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা ওয়াইনের আঙ্গুরে থাকা কার্বন-১৪ বিশ্লেষণ করে নির্ভুলভাবে উৎপাদন সাল নির্ধারণে সক্ষম হয়েছেন। একইভাবে, গ্রিনল্যান্ডের গভীর সাগরে থাকা শতবর্ষী হাঙরের চোখের লেন্স পরীক্ষা করে জানা গেছে, তারা ৪০০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে।
এই বোমা চিহ্ন এখন ভূতত্ত্বেও ব্যবহৃত হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা ২০২৩ সালে কানাডার ক্রফোর্ড হ্রদের তলায় এক নির্দিষ্ট স্তরে কার্বন-১৪, প্লুটোনিয়াম, সিজিয়াম-১৩৭সহ অন্যান্য মানবসৃষ্ট উপাদানের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। তাই, তাঁরা প্রস্তাব করেছেন এটি হোক “অ্যানথ্রোপোসিন যুগ”-এর আনুষ্ঠানিক সূচনার প্রতীকী ‘গোল্ডেন স্পাইক’। যদিও ২০২৪ সালে এ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয় এবং আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পিছিয়ে যায়, তবুও এই হ্রদ এবং কার্বন-১৪ বিশ্লেষণ ভবিষ্যতের গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
আপনার শরীরেও সেই চিহ্ন থাকতে পারে?
হ্যাঁ, যদি আপনি বা আপনার পূর্বপুরুষরা সেই সময়ের পর জন্ম নিয়ে থাকেন, তাহলে হয়তো আপনার শরীরের DNA, হাড় বা কোষেও মিশে আছে সেই অতিরিক্ত কার্বন-১৪। অর্থাৎ আপনি নিজের অজান্তেই এক ধরণের “চলন্ত ইতিহাস” হয়ে উঠেছেন।
আরও পড়ুন:
❒ বিশ্বে কতগুলো পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরিত হয়েছে?
❒ বিএমডব্লিউ সম্পর্কে ১০টি অজানা তথ্য
❒ জেন-জি ও মিলেনিয়ালস প্রজন্ম ফোনকল এড়িয়ে চলে কেন?
❒ বিশ্বের বিস্ময়কর ৫ সামুদ্রিক সেতু যা দেখলে চোখ জুড়িয়ে যাবে
❒ রহস্যময় এই সেতু থেকে কুকুর কেন লাফিয়ে আত্মহত্যা করে
❒ টাইটানিক জাহাজের অজানা কিছু রহস্য
এটা ক্ষতিকর?
না, এই পরিমাণ কার্বন-১৪ মানবদেহে তেমন ক্ষতিকর নয়। বরং, বিজ্ঞানীরা এটিকে কাজে লাগান DNA বিশ্লেষণ, অপরাধ তদন্ত, এমনকি প্রাচীন জীবাশ্মের বয়স নির্ধারণে।
আপনি যতই আধুনিক হোন, আপনার শরীরে আছে ইতিহাসের ছাপ—বিশ্বযুদ্ধ, বিজ্ঞানের উৎকর্ষ, এবং মানবজাতির উত্থান-পতনের নিঃশব্দ চিহ্ন। তাই বলা যায়—আমরা সবাই একটু পারমাণবিক বোমার উত্তরসূরি!
❑ জানা-অজানা বিশ্ব থেকে আরও পড়ুন
আরও পড়ুন: ইস্তাম্বুল পৃথিবীর আশ্চর্যজনক বিড়ালের শহর

